আগামী মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে মুখিয়ে থাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এ তথ্য প্রকাশ করেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
সাংবাদিক প্রাণসু বর্মার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামি কয়েকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র বিক্ষোভের আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। দলটি দীর্ঘদিন ধরে শরিয়াহ আইনকে শাসনের ভিত্তি হিসেবে দেখায় এবং নারীদের ‘সন্তান পালন’সহ কাজ কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জনমত নরম করতে এবং সমর্থন বাড়াতে তারা ‘দুর্নীতি নির্মূল’কে তাদের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিং থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকরা পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত ১ ডিসেম্বর এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ “ইসলামিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে” এবং ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত “আগের চেয়ে ভালো করবে”। ওই কূটনীতিক বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।”
নিরাপত্তার কারণে ওই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তিনি জামায়াতের শরিয়াহ আরোপের সম্ভাবনাকে তুচ্ছ বলেও মন্তব্য করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন সুবিধা রয়েছে যা তারা ব্যবহার করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি না জামায়াত শরিয়াহ আরোপ করতে পারে।” আর যদি দলটি উদ্বেগজনক কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র “পরদিন তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে” বলে হুঁশিয়ারি দেন।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি এই বিষয়ে বলেন, ডিসেম্বরে কথোপকথনটি ছিল নিয়মিত আলোচনা এবং এটি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রেকর্ডবিহীনভাবে হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে অন্য দলের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দেয় না এবং বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জামায়াতের মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, “একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে করা মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে আমরা মন্তব্য না করার সিদ্ধান্ত নিই।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই মন্তব্যগুলো ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকদের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন তার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়ার জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর একটি নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ভারতের ভয়ের তালিকায় জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষে—কারণ ভারত দলটিকে পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে দেখে এবং তা তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন “মার্কিন-ভারত সম্পর্কের ওপর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ইতোমধ্যেই তলানিতে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সাবেক প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই সময়ে ভারত তাকে প্রত্যর্পণ না করে নির্দিষ্ট কারণ দেখায়।
অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, “বাংলাদেশ একটি পরিবার। আমাদের একে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।” গত সপ্তাহে তিনি এক্স পোস্টে বলেন, আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও সময়মতো হবে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী ভূমিকা দেখাতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি রাজনীতির বিশেষজ্ঞ মুবাশ্বার হাসান বলেন, হাসিনার অধীনে নিষিদ্ধ হওয়ার পর প্রচারণার সময় দলটি গতিশীল হয়েছে এবং এখন মূলধারায় আসছে।
জামায়াতের মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, দলটি ‘দুর্নীতিবিরোধী, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন’ নিয়ে কাজ করছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাবটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে এবং শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের কোনো পরিকল্পনা দলের নেই।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?