তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে। শুক্রবার ইরানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চ্যুয়াল দূতাবাস এক নিরাপত্তা সতর্কতায় এই নির্দেশনা জারি করে।
এর আগে শুক্রবার সকালে ওমানের রাজধানী মাসকাটে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ শান্তিদূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গত গ্রীষ্মে ১২ দিনের সংঘাতের পর এটিই ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম সরাসরি মুখোমুখি আলোচনা। আলোচনার আয়োজন করেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি। এতে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে ‘আর্মাডা’ বা বিশাল নৌবহর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে সই না করলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
শুক্রবারের আলোচনার আগে জারি করা সতর্কতায় মার্কিন নাগরিকদের বলা হয়, ‘এখনই ইরান ছাড়ুন’। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবি কিংবা হঠকারিতা’র বিরুদ্ধে ইরান আত্মরক্ষায় প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, আলোচনার আগে কূটনৈতিক পথের সুযোগও হাতছাড়া করতে চায় না তেহরান।
ইরানের প্রধান মিত্র চীন এই প্রেক্ষাপটে তেহরানের স্বার্থ রক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং ওয়াশিংটনের ‘একতরফা গুন্ডামি’র বিরোধিতা করেছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানান, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘শূন্য পারমাণবিক সক্ষমতা’ নিশ্চিত করার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে ‘অনেক বিকল্প খোলা আছে’।
ওয়াশিংটনের মূল দাবি হলো—ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে এবং মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমস অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার টেবিলে আঞ্চলিক পক্ষগুলোকে না রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। যদিও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু পারমাণবিক ইস্যু, তবু একটি চুক্তির কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হবে।
ইরানে ইসলামি নেতাদের বিরুদ্ধে চলমান দেশব্যাপী আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পশ্চিমাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিক্ষোভ দমনে সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) আলোচনা করছে। তারা চায় না আমরা তাদের ওপর হামলা করি। আমাদের একটি বড় নৌবহর সেখানে যাচ্ছে।’ এর আগে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনায় সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার দিকেই বেশি জোর দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা করে আসছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘সব বিকল্প খোলা রাখবেন’। তিনি জানান, কূটনৈতিক উপায়ে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হবে, তবে প্রয়োজন হলে সামরিক পথও বেছে নেওয়া হতে পারে।
ইরানের দাবি, গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই হামলায় তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে যায়।
You Must be Registered Or Logged in To Comment লগ ইন করুন?